সংগ্রামী কবি বশিরুজ্জামান বশির: জীবন, সংগ্রাম ও সাহিত্য।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া অনেক মানুষের জীবন যেমন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল, তেমনি সংগ্রাম ও দুঃখের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে কবি বশিরুজ্জামান বশিরের জীবন।

দুঃখে যাদের জীবন নির্মিত, তাদের কাছে দুঃখ যেন আর নতুন কিছু নয়। বরং সেই দুঃখকে জয় করার শক্তি থেকেই জন্ম নেয় প্রতিবাদ, মানবিকতা এবং সৃষ্টিশীলতা।

এই সংগ্রামী চেতনার প্রতীক ছিলেন কবি বশিরুজ্জামান বশির। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, সাহসী কলমযোদ্ধা এবং গণমানুষের পক্ষে এক দৃঢ় সাহিত্যিক কণ্ঠ। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি আপসহীনভাবে সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।

ঝাঁকড়া চুলের বাবরি, নিরহংকার, নির্লোভ ও নির্মোহ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই মানুষটি সাহিত্যাঙ্গনে ছিলেন এক সাদা মনের মানুষ।

কবি বশিরুজ্জামান বশির শুধু একজন লেখক নন; তিনি ছিলেন প্রকাশক, সমাজসেবক, গীতিকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক, পরিচালক এবং অভিনেতা।

কবি বশিরুজ্জামান বশির জন্মগ্রহণ করেন ১২ মাঘ ১৩৮০ বঙ্গাব্দ, ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বরিশাল জেলার কোতোয়ালি থানার ৭ নং চরকাউয়া ইউনিয়নের পেটকাটা গ্রামে মুন্সিবাড়ি মুন্সি বংশে।

তার পিতা ছিলেন মরহুম রসুল আলী মুন্সী এবং মাতা রওশন আরা বেগম মিনারা।

বর্তমানে তার বসবাস ছিল বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের রূপাতলী গ্যাস টারবাইন সড়ক এলাকায়, সামিট পাওয়ার লিমিটেড সংলগ্ন এলাকায়।

তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল ঝালকাঠি সরকারি শিশু সদন (এতিমখানা) থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

বাংলা সাহিত্যের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সবাই “দুখু মিয়া” নামে জানে।

ঠিক তেমনি দুঃখ ও সংগ্রামের আরেক প্রতীক হয়ে ওঠেন বরিশালের সন্তান বশিরুজ্জামান বশির।

১৯৮০ সালে তার পিতা রসুল আলী মুন্সীর মৃত্যুর পর পরিবারে নেমে আসে চরম সংকট। মা রওশন আরা বেগম মিনারা সন্তানকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে বরিশালে চলে আসেন।

১৯৮১ সালে তিনি শিশুপুত্র বশিরকে বরিশালের জর্ডন রোডে অবস্থিত একটি খ্রিস্টান মিশন স্কুলে বিনা বেতনে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করান। সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন।

পরবর্তীতে সেখানে উচ্চতর শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ না থাকায় তাকে ঝালকাঠি জেলার সরকারি শিশু সদন (এতিমখানা) এ আবার প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেন। কিন্তু দারিদ্র্যের বাস্তবতা তাকে বেশিদিন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দেয়নি। ১৯৮৯ সালে অষ্টম শ্রেণির দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা দেওয়ার পর তিনি পড়াশোনার ইতি টানেন এবং শুরু হয় তার কঠিন জীবনসংগ্রাম।

মা, আছিয়ারা যেখানে আছে
ওদের সেখানেই থাকতে বলো;
পান্তা ভাত আর কচু শাক খেয়ে
আছিয়ারা বেশ ভালো আছে।

মা, বিশ্বাস কর—
আমরা আজও স্বাধীনতা পাইনি।
এক একমুঠো ভাতের নাম আছিয়ার ঈদ,
আছিয়ার গণতন্ত্র, আছিয়ার স্বাধীনতা।


১৯৮৯ সালে মাত্র ৫০০ টাকা নিয়ে তিনি সাগর লঞ্চে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

কিন্তু লঞ্চে বসেই পকেটমারের হাতে সেই টাকা হারিয়ে ফেলেন।

ঢাকায় তার কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না। ফলে তাকে অনেকদিন রাস্তায় রাত কাটাতে হয়েছে। প্রথম রাতে তিনি গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বারান্দায় আশ্রয় নেন। কিন্তু সেই রাতেই তার ব্যাগসহ জামাকাপড় চুরি হয়ে যায়।

জীবিকার তাগিদে তিনি বিভিন্ন পেশায় কাজ করেছেন—ঠেলাগাড়ির হেলপার, রিকশা চালক, নর্সন্দরসহ নানা শ্রমজীবী কাজ। মা দীর্ঘদিন সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে ঢাকায় এসে খুঁজতে খুঁজতে গাবতলী বাস টার্মিনালে তার সঙ্গে দেখা পান। পরে এক পরিচিত অবসরপ্রাপ্ত দারোগার সহযোগিতায় তিনি বাইতুল মোকাররম মসজিদের সামনে ভাগ্য গণনার কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে একটি চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে যান এবং দুই বছর পর আবার ঢাকায় ফিরে আসেন।

১৯৯২ সালে মোহাম্মদপুর টেকেরপাড়ায় একটি বস্তিতে ১৬০ টাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে শ্যামলী এসওএস শিশু পল্লী এতিমখানার সামনে ভাগ্য গণনার কাজ শুরু করেন। কিন্তু অনুমতি ছাড়া ফুটপাতে ব্যবসা করার অপরাধে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং কিছুদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকতে হয়। এখানেই শেষ হয় অন্যের ভাগ্য গণনার কাজ।

সাহিত্যচেতনার বিকাশ

এতিমখানায় থাকাকালীন ১৯৮৮ সালের বন্যা তাকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। দারিদ্র্য ও মানুষের দুর্দশা তার মনে গভীর মানবিক বোধ সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য তিনি কলম হাতে তুলে নেন। তার কবিতায় বারবার ফিরে আসে বঞ্চিত মানুষের ছবি।


ডাস্টবিনের পাশে বসে দিনরাত কাঁদছো কেন? প্রশ্ন করার আগেই শিশুটি উল্টো আমাকে প্রশ্ন করল— এখানে কী চান? আমরা কি স্বাধীনতা টোকাই?

তার সাহিত্যজীবন শুরু হয় ১৯৮৮ সালে “গরিবের স্বপ্ন” চলচ্চিত্র কাহিনী রচনার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি অসংখ্য কবিতা, গল্প, নাটক ও গান রচনা করেন এবং প্রকাশনা কার্যক্রমেও যুক্ত হন।

প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা: প্রায় ১৫টি, সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা: ৩৫টিরও বেশি।

আমার সেই মুক্তিযোদ্ধা, আবার আমরা যুদ্ধ যাব, বাংলার মাটি ছাড়, ভূতের পাঠশালা, বাদশার বাদশাহী ,পরীর হাতে নীল চুড়ি ,পোস্টারে তোমাকে চাই, একদিন তুমি কাঁদবে ,পিংকির বিড়াল ,রহস্য স্বদেশ জরিপ ,পেঁয়াজের গণতন্ত্র ,এইডস প্রতিরোধের ছড়া ,বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের ছড়া, এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধের ছড়া

তিনি “দেড় সতিনের ঝগড়া” নামে একটি কমেডি অ্যালবাম পরিচালনা করেন এবং “মা” নামে একটি শর্ট ফিল্ম নির্মাণ ও “আরাধনা” টেলিফিল্মে অভিনয় করেন। ছোটবেলা থেকে আঞ্চলিক কয়েকটি গানও রচনা করেছেন, যেমন “বরিশাল আমার প্রাণ”

বরিশাল আমার প্রাণ (গান)
গীতিকার: কবি বশিরুজ্জামান বশির

ও মাঝি রে…
নাও বাইয়া যাইও ধীরে…
বরিশালের মাটির গন্ধ
ভাসে নদীর নীরে।

জন্ম আমার বরিশালে কীর্তনখোলার তীরে,
কীর্তনখোলার রূপ দেখিতে হাজার মানুষ ভিড়ে।
ধানসিঁড়ি নদীর পাড়ে রে ভাই
হাওয়া লাগে প্রাণে,
বরিশালের মাটির গন্ধ
ভাসে আমার গানে।

অন্তরা – ১
ওই কীর্তনখোলার ঢেউ রে ভাই
ডাকে মাঝির নাও,
দখিন হাওয়া বইলে নদী
গায় ভাটিয়ালি গাও।
ধানসিঁড়ির তীরে বসে
কত কবির গান,
সবুজ ধানের মাঠে বাজে
বাংলা মাটির তান।

অন্তরা – ২
এই মাটিরই গর্ব রে ভাই
এ.কে.এম ফজলুল হক শেরেবাংলা নাম,
গরিব দুখীর পাশে দাঁড়ায়
করছে দেশের কাম।
ধানসিঁড়ির পথে পথে
কবির স্বপ্ন ভাসে,
বাংলার রূপ লিখে গেছে
জীবনানন্দ দাশ।


অন্তরা – ৩ বরিশালের মাটিতে রে ভাই

গুণীজনের ভিড়,

কবি, নেতা, জ্ঞানী মানুষ এই মাটিরই নীড়।

নদী, হাওয়া, মাঠের মাঝে বাংলার প্রাণের গান,

কীর্তনখোলা বুকের ভেতর বরিশাল আমার প্রাণ।


জন্ম আমার বরিশালে কীর্তনখোলার তীরে,

কীর্তনখোলার রূপ দেখিতে হাজার মানুষ ভিড়ে।

ধানসিঁড়ি নদীর পাড়ে রে ভাই হাওয়া লাগে প্রাণে,

বরিশালের মাটির গন্ধ ভাসে আমার গানে।

ও মাঝি রে নাওডা ধীরে বাইও নদীর নীল নীরে,

বরিশাল আমার প্রাণের মাটি কীর্তনখোলার তীরে।

তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন—

রাতুল গ্রন্থ প্রকাশ কবি বশিরুজ্জামান বশির ফাউন্ডেশন স্বদেশ মৃত্তিকা মানব উন্নয়ন সংস্থা পারিজাত মানবিক উন্নয়ন সংস্থা কবি বশিরুজ্জামান বশির সাহিত্য পরিষদ

প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মানবকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করতেন। তার প্রকাশনা থেকে অর্জিত লাভের ২৫% তিনি মানবসেবায় ব্যয় করতেন।

২০২৩ সালের ১০ মার্চ ব্রেন স্ট্রোক; পরে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার স্ট্রোক ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিকেল ৫টায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৫২ বছর।

কবি বশিরুজ্জামান বশির ছিলেন আপাদমস্তক সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। প্রচারবিমুখ ও তোষামোদিবিরোধী হওয়ায় জীবদ্দশায় হয়তো যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। তবু তার সংগ্রামী জীবন, মানবিক কর্মকাণ্ড এবং সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আমরা সাহিত্যপ্রেমীরা নব্বই দশকের এই সংগ্রামী কবির জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে মরণোত্তর পদক প্রদানের দাবি জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *